আত্মপরিচয়
তাহাকেই আমি সমাজের দুঃস্বপ্ন বলিয়া মনে করি — এই কারণে তাহাই জটিল , তাহাই অদ্ভুত অসংগত , তাহাই মানবধর্মের বিরুদ্ধ ।

হিন্দু শব্দে এবং মুসলমান শব্দে একই পর্যায়ের পরিচয়কে বুঝায় না । মুসলমান একটি বিশেষ ধর্ম কিন্তু হিন্দু কোনো বিশেষ ধর্ম নহে । হিন্দু ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি জাতিগত পরিণাম । ইহা মানুষের শরীর মন হৃদয়ের নানা বিচিত্র ব্যাপারকে বহু সুদূর শতাব্দী হইতে এক আকাশ , এক আলোক , এক ভৌগোলিক নদনদী অরণ্য - পর্বতের মধ্য দিয়া , অন্তর ও বাহিরের বহুবিধ ঘাতপ্রতিঘাত - পরম্পরার একই ইতিহাসের ধারা দিয়া আজ আমাদের মধ্যে আসিয়া উত্তীর্ণ হইয়াছে । কালীচরণ বাঁড়ুজ্যে , জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর , কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় খ্রীস্টান হইয়াছিলেন বলিয়াই এই সুগভীর ধারা হইতে বিচ্ছিন্ন হইবেন কী করিয়া ? জাতি জিনিসটা মতের চেয়ে অনেক বড়ো এবং অনেক অন্তরতর ; মত পরিবর্তন হইলে জাতির পরিবর্তন হয় না । ব্রহ্মাণ্ডের উৎপত্তিসম্বন্ধে কোনো একটা পৌরাণিক মতকে যখন আমি বিশ্বাস করিতাম তখনও আমি যে জাতি ছিলাম তৎসম্বন্ধে আধুনিক বৈজ্ঞানিক মত যখন বিশ্বাস করি তখনও আমি সেই জাতি । যদিচ আজ ব্রহ্মাণ্ডকে আমি কোনো অণ্ডবিশেষ বলিয়া মনে করি না ইহা জানিতে পারিলে এবং সুযোগ পাইলে আমার প্রপিতামহ এই প্রকার অদ্ভুত নব্যতায় নিঃসন্দেহ আমার কান মলিয়া দিতেন ।

কিন্তু চীনের মুসলমানও মুসলমান , পারস্যেরও তাই , আফ্রিকারও তদ্রূপ । যদিচ চীনের মুসলমানসম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না তথাপি এ কথা জোর করিয়াই বলিতে পারি যে , বাঙালি মুসলমানের সঙ্গে তাহাদের ধর্মমতের অনেকটা হয়তো মেলে কিন্তু অন্য অসংখ্য বিষয়েই মেলে না । এমন - কি , ধর্মমতেরও মোটামুটি বিষয়ে মেলে কিন্তু সূক্ষ্ম বিষয়ে মেলে না । অথচ হাজার হাজার বিষয়ে তাহার স্বজাতি কন্‌ফ্যুসীয় অথবা বৌদ্ধের সঙ্গে তাহার মিল আছে । পারস্যে চীনের মতো কোনো প্রাচীনতর ধর্মমত নাই বলিলেই হয় । মুসলমান বিজেতার প্রভাবে সমস্ত দেশে এক মুসলমান ধর্মই স্থাপিত হইয়াছে তথাপি পারস্যে মুসলমান ধর্ম সেখানকার পুরাতন জাতিগত প্রকৃতির মধ্যে পড়িয়া নানা বৈচিত্র্য লাভ করিতেছে — আজ পর্যন্ত কেহ তাহাকে ঠেকাইয়া রাখিতে পারিতেছে না ।

ভারতবর্ষেও এই নিয়মের ব্যতিক্রম হইতে পারে না । এখানেও আমার জাতিপ্রকৃতি আমার মতবিশেষের চেয়ে অনেক ব্যাপক । হিন্দুসমাজের মধ্যেই তাহার হাজার দৃষ্টান্ত আছে । যে - সকল আচার আমাদের শাস্ত্রে এবং প্রথায় অহিন্দু বলিয়া গণ্য ছিল আজ কত হিন্দু তাহা প্রকাশ্যেই লঙ্ঘন করিয়া চলিয়াছে ; কত লোককে আমরা জানি যাঁহারা সভায় বক্তৃতা দিবার ও কাগজে প্রবন্ধ লিখিবার বেলায় আচারের স্খলন লেশমাত্র সহ্য করিতে পারেন না অথচ যাঁহাদের পানাহারের তালিকা দেখিলে মনু ও পরাশর নিশ্চয়ই উ দ্‌বি গ্ন হইয়া উঠিবেন এবং রঘুনন্দন আনন্দিত হইবেন না । তাঁহাদের প্রবন্ধের মত অথবা তাঁহাদের ব্যাবহারিক মত , কোনো মতের ভিত্তিতেই তাঁহাদের হিন্দুত্ব প্রতিষ্ঠিত নহে , তাহার ভিত্তি আরো গভীর । সেইজন্যই হিন্দুসমাজে আজ যাঁহারা আচার মানেন না , নিমন্ত্রণ রক্ষায় যাঁহারা ভাটপাড়ার বিধান রক্ষা করেন না , এবং গুরু বাড়ি আসিলে গুরুতর কাজের ভিড়ে যাঁহাদের অনবসর ঘটে , তাঁহারাও স্বচ্ছন্দে হিন্দু বলিয়া গণ্য হইতেছেন । তাহার একমাত্র কারণ এ নয় যে হিন্দুসমাজ দুর্বল — তাহার প্রধান কারণ এই যে , সমস্ত বাঁধাবাঁধির মধ্যেও হিন্দুসমাজ একপ্রকার অর্ধচেতন ভাবে অনুভব করিতে পারে যে , বাহিরের এই - সমস্ত পরিবর্তন হাজার হইলেও তবু বাহিরের — যথার্থ হিন্দুত্বের সীমা এইটুকুর মধ্যে কখনোই বদ্ধ নহে ।

যে কথাটা সংকীর্ণ বর্তমানের উপস্থিত অবস্থাকে অতিক্রম করিয়া বৃহৎভাবে সত্য , অনেক পাকা লোকেরা তাহার উপরে কোনো আস্থাই রাখেন না । তাঁহারা মনে করেন এ - সমস্ত নিছক আইডিয়া । মনে করেন করুন কিন্তু আমাদের সমাজে আজ এই আইডিয়ার প্রয়োজনই সকলের চেয়ে বড়ো প্রয়োজন । এখানে জড়ত্বের আয়োজন যথেষ্ট আছে যাহা পড়িয়া থাকে , বিচার করে না , যাহা অভ্যাসমাত্র , যাহা নড়িতে চায় না তাহা এখানে যথেষ্ট আছে , এখানে কেবল সেই তত্ত্বেরই অভাব দেখিতেছি , যাহা সৃষ্টি করে , পরিবর্তন করে , অগ্রসর করে , যাহা বিচিত্রকে অন্তরের দিক হইতে মিলাইয়া এক করিয়া দেয় । হিন্দুসমাজ ব্রাহ্মসমাজের