হিন্দু-বিশ্ববিদ্যালয়

কিন্তু আধুনিক শিক্ষিত সমাজেই এই ভাবটা বাড়িয়া উঠিতেছে কেন , এ প্রশ্ন স্বতই মনে উদিত হয় । শিক্ষা পাইলে বুদ্ধিবৃত্তির প্রতি লোকের অনাস্থা জন্মে বলিয়াই যে এমনটা ঘটে তাহা আমি মনে করি না । আমি পূর্বেই ইহার কারণ সম্বন্ধে আলোচনা করিয়াছি ।

শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে আমাদের স্বাতন্ত্র্য-অভিমানটা প্রবল হইয়া উঠিতেছে । এই অভিমানের প্রথম জোয়ারে বড়ো একটা বিচার থাকে না , কেবল জোরই থাকে । বিশেষত এতদিন আমরা আমাদের যাহা - কিছু সমস্তকেই নির্বিচারে অবজ্ঞা করিয়া আসিয়াছি — আজ তাহার প্রবল প্রতিক্রিয়ার অবস্থায় আমরা মাঝে মাঝে বৈজ্ঞানিক বিচারের ভান করি , কিন্তু তাহা নির্বিচারেরও বাড়া ।

এই তীব্র অভিমানের আবিলতা কখনোই চিরদিন টিঁকিতে পারে না — এই প্রতিক্রিয়ার ঘাত প্রতিঘাত শান্ত হইয়া আসিবেই — তখন ঘর হইতে এবং বাহির হইতে সত্যকে গ্রহণ করা আমাদের পক্ষে সহজ হইবে ।

হিন্দুসমাজের পূর্ণ বিকাশের মূর্তি আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ ব্যাপার নহে । সুতরাং হিন্দু কী করিয়াছে ও কী করিতে পারে সে সম্বন্ধে আমাদের ধারণা দুর্বল ও অস্পষ্ট । এখন আমরা যেটাকে চোখে দেখিতেছি সেইটেই আমাদের কাছে প্রবল । তাহা যে নানারূপে হিন্দুর যথার্থ প্রকৃতি ও শক্তিকে আচ্ছন্ন করিয়া তাহাকে বিনাশ করিতেছে এ কথা মনে করা আমাদের পক্ষে কঠিন । পাঁজিতে যে সংক্রান্তির ছবি দেখা যায় আমাদের কাছে হিন্দু সভ্যতার মূর্তিটা সেই রকম । সে কেবলই যেন স্নান করিতেছে , জপ করিতেছে , এবং ব্রত উপবাসে কৃশ হইয়া জগতের সমস্ত কিছুর সংস্পর্শ পরিহার করিয়া অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে এক পাশে দাঁড়াইয়া আছে । কিন্তু একদিন এই হিন্দু সভ্যতা সজীব ছিল , তখন সে সমুদ্র পার হইয়াছে , উপনিবেশ বাঁধিয়াছে , দিগ্‌বিজয় করিয়াছে , দিয়াছে এবং নিয়াছে ; তখন তাহার শিল্প ছিল , বাণিজ্য ছিল , তাহার কর্মপ্রবাহ ব্যাপক ও বেগবান ছিল ; তখন তাহার ইতিহাসে নব নব মতের অভ্যুত্থান , সমাজবিপ্লব ও ধর্মবিপ্লবের স্থান ছিল ; তখন তাহার স্ত্রীসমাজেও বীরত্ব , বিদ্যা ও তপস্যা ছিল ; তখন তাহার আচার - ব্যবহার যে চিরকালের মতো লোহার ছাঁচে ঢালাই করা ছিল না মহাভারত পড়িলে পাতায় পাতায় তাহার পরিচয় পাওয়া যায় । সেই বৃহৎ বিচিত্র , জীবনের - বেগে - চঞ্চল , জাগ্রত চিত্তবৃত্তির তাড়নায় নব নব অধ্যবসায়ে প্রবৃত্ত হিন্দু সমাজ — যে সমাজ ভুলের ভিতর দিয়া সত্যে চলিয়াছিল ; পরীক্ষার ভিতর দিয় া সিদ্ধান্তে ও সাধনার ভিতর দিয়া সিদ্ধিতে উত্তীর্ণ হইতেছিল ; যাহা শ্লোকসংহিতার জটিল রজ্জুতে বাঁধা কলের পুত্তলীর মতো একই নির্জীব নাট্য প্রতিদিন পুনরাবৃত্তি করিয়া চলিতেছিল না ; বৌদ্ধ যে সমাজের অঙ্গ , জৈন যে সমাজের অংশ ; মুসলমান ও খ্রীস্টানেরা যে সমাজের অন্তর্গত হইতে পারিত ; যে সমাজের এক মহাপুরুষ একদা অনার্যদিগকে মিত্ররূপে গ্রহণ করিয়াছিলেন , আর - এক মহাপুরুষ কর্মের আদর্শকে বৈদিক যাগযজ্ঞের সংকীর্ণতা হইতে উদ্ধার করিয়া উদার মনুষ্যত্বের ক্ষেত্রে মুক্তিদান করিয়াছিলেন এবং ধর্মকে বাহ্য অনুষ্ঠানের বিধিনিষেধের মধ্যে আবদ্ধ না করিয়া তাহাকে ভক্তি ও জ্ঞানের প্রশস্ত পথে সর্বলোকের সুগম করিয়া দিয়াছিলেন ; সেই সমাজকে আজ আমরা হিন্দুসমাজ বলিয়া স্বীকার করিতেই চাই না — যাহা চলিতেছে না তাহাকে আমরা হিন্দুসমাজ বলি ;— প্রাণের ধর্মকে আমরা হিন্দুসমাজের ধর্ম বলিয়া মানিই না , কারণ , প্রাণের ধর্ম বিকাশের ধর্ম , পরিবর্তনের ধর্ম , তাহা নিয়ত গ্রহণ -ব র্জনের ধর্ম ।

এই জন্যই মনে আশঙ্কা হয় যাঁহারা হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করিতে উদ্‌যোগী , তাঁহারা কিরূপ হিন্দুত্বের ধারণা লইয়া এই কার্যে প্রবৃত্ত ? কিন্তু সেই আশঙ্কামাত্রেই নিরস্ত হওয়াকে আমি শ্রেয়স্কর মনে করি না । কারণ , হিন্দুত্বের ধারণাকে তো আমরা নষ্ট করিতে চাই না , হিন্দুত্বের ধারণাকে আমরা বড়ো করিয়া তুলিতে চাই । তাহাকে চালনা করিতে দিলে আপনি সে বড়ো হইবার দিকে যাইবেই — তাহাকে গর্তের মধ্যে বাঁধিয়া রাখিলেই তাহার ক্ষুদ্রতা ও বিকৃতি অনিবার্য । বিশ্ববিদ্যালয় সেই চালনার ক্ষেত্র — কারণ সেখানে বুদ্ধিরই ক্রিয়া , সেখানে চিত্তকে সচেতন করারই আয়োজন । সেই চেতনার স্রোত প্রবাহিত হইতে থাকিলে আপনিই